🖋️সাইফুল ইসলাম তুহিন
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতা ক্রমেই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নৈতিকতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ যেন পিছনের সারিতে ঠাঁই পাচ্ছে। সমাজ পরিচালিত হচ্ছে মূলত স্বার্থপর মানুষের ইচ্ছা ও হিসাব-নিকাশে, আর এই ব্যবস্থায় মিথ্যাবাদীরাই অনেক সময় বিজয়ীর আসনে বসছে। এই নির্মম বাস্তবতাকে সংক্ষেপে কিন্তু গভীরভাবে তুলে ধরেছে একটি প্রোফাইল নোট— “দুনিয়া টা স্বার্থপর মানুষের উপর দিয়ে চলে, আর মিথ্যাবাদীরা জয়ী হয়।” বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি যেন বহু মানুষের মনের ভাষা হয়ে উঠেছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক জীবনের তীব্র প্রতিযোগিতা মানুষকে দিন দিন আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। নিজের সুবিধা আদায়ের জন্য কেউ সম্পর্ক ভাঙতে দ্বিধা করছে না, কেউ আবার সত্যকে আড়াল করে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাজনীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি পারিবারিক সম্পর্কেও এই স্বার্থপরতার ছাপ স্পষ্ট। এর ফলে সত্যবাদী মানুষকে অনেক সময় নীরবে অপমান, বঞ্চনা কিংবা পরাজয় মেনে নিতে হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এখানে সত্যের চেয়ে প্রচার, নৈতিকতার চেয়ে জনপ্রিয়তা এবং বাস্তবতার চেয়ে সাজানো মিথ্যাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভুল তথ্য, গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেগুলোর নেপথ্যে থাকা মানুষগুলোই কখনো কখনো সমাজে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষের মাঝে হতাশা ও অবিশ্বাস বাড়ছে।
শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সমাজের নৈতিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন প্রজন্ম যদি দেখে যে মিথ্যা বলেই সাফল্য পাওয়া যায়, আর সততা বজায় রেখে টিকে থাকা কঠিন—তাহলে তারা কোন মূল্যবোধ ধারণ করবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ রয়েছে। সততা তখন আর আদর্শ নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ একটি পথ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে এই অন্ধকার চিত্রের মাঝেও আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মিথ্যা যত শক্তিশালীই হোক, তা কখনো স্থায়ী হয় না। সত্যকে চাপা দেওয়া যায় সাময়িকভাবে, কিন্তু সময়ের প্রবাহে তা আবারও প্রকাশ পায়। অনেক মানুষ এখনও নীরবে হলেও সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল রয়েছেন, যাদের বিশ্বাস—আজ না হোক, কাল সত্যেরই জয় হবে।
বর্তমান সমাজের এই বাস্তবতায় কেবল একটি ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতিবাদ, এক নিঃশব্দ আর্তনাদ। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—আমরা কি সত্যিই এমন এক সমাজ চাই, যেখানে স্বার্থপরতা শক্তি আর মিথ্যা সাফল্যের চাবিকাঠি? নাকি এখনও সময় আছে, মূল্যবোধে ফিরে যাওয়ার, সত্যকে আবারও সম্মানের আসনে বসানোর।
Leave a Reply